পবিত্র মাহে রমজান- রোজার ইতিহাস

0
186
পবিত্র মাহে রমজান- রোজার ইতিহাস

রোজার ইতিহাস বলতে গেলে, বস্তুত রোজা রাখার বিধাণ প্রতি যুগেই ছিল। হযরত আদম (আঃ) থেকে শুরু করে আখিরী নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) পর্যন্ত সকল নবীরাসূলগণের যুগেই রোজার বিধান ছিল। এদিকে ইঙ্গিত করে আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ

হে ইমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমাদের পরহেয্‌গারী অর্জিত হয়;

সূরাবাকারা, আয়াত ১৮৩

এ আয়তের ব্যখ্যায় আল্লামা আলূসী (রঃ) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থ ‘রুহুল মাআনী’ তে উল্লেখ করেছেন যে এখানে ‘মিন ক্বাবলিকুম’ দ্বারা হযরত আদম (আঃ) হতে শুরু করে হযরত ঈসা (আঃ) এর যুগ পর্যন্ত সকল যুগের মানুষকে বুঝানো হয়েছে। এতে এ কথা দ্বারা বোঝা যাচ্ছে  যে, রোযা কেবল আমাদের উপরই ফরয করা হয়নি বরং আদম (আঃ) এর যুগ হতেই চলে এসেছে । অন্যান্য তাফসীর বিশারদগণও ঠিক একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান (রঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেনঃ

রোযার হুকুম হযরত আদম (আঃ) এর যুগ হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে চলে এসেছে

— ফাওয়াইদে উসমানী

তবে হযরত আদম (আঃ) এর রোযার ধরন কেমন ছিল তা সঠিকভাবে বলা যায় না। আল্লামা ইমাদুদ্দীন ইবন কাশীর (রঃ) বলেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখার বিধান ছিল। পরে রমজানের রোযা ফরয হলে তা রহিত হয়ে যায় । হযরত মু’আয, ইবন মাসউদ, ইবন আব্বাস, আতা, কাতাদা এবং যাহ্‌হাক (রাঃ) এর মতে তিন দিন রোযা রাখার বিধান হযরত নূহ (আঃ) এর যুগ হতে শুরু করে নবী করিম (সঃ) এর জামানা পর্যন্ত বলবৎ ছিল । পরে আল্লাহ্‌ তা’আলা রামাযানের রোযা ফরজ করে ঐ বিধান রহিত করে দেন।
তাফসীরে রুহুল মা’আনীতে এ কথাও উল্লেখ রয়েছে যেঃ
যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদের দেওয়া হয়েছিল বলে যে তুলনা করা হয়েছে তা শুধু ফরয হওয়ার ব্যাপারে প্রযোজ্য হতে পারে। অর্থাৎ তোমাদের উপর যেমন রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরও রোযা ফরজ করা হয়েছিল। যদিও নিয়ম এবং সময়ের দিক থেকেও এ তুলনা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই বলা হয়যে, কিতাবিদের উপরও রামাযানের রোযা ফরজ ছিল। তারা তা বর্জন করে বছরে ঐ একদিন উপবাসব্রত পালন করে, যেদিন ফির’আউন নীলনদে নিমজ্জিত হয়েছিল । এরপর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও উক্ত দিনে রোজা রাখে। অবশ্য তারা এর সাথে আগে-পিছে আরো দুইদিন সংযোজন করে নেয়। এভাবে বাড়াতে বাড়াতে তারা রোজার সংখ্যা পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে দেয়। গরমের দিন এ রোজা তাঁদের জন্য দুঃসাধ্য হলে তারা তা পরিবর্তন করে শীতের মৌসুমে নিয়ে আসে।

মুগাফ্‌ফাল ইব্‌ন হানযালা (রাঃ) থেকে বর্নিত। রাসূলুল্লাহ (সঃ) ইরশাদ করেন খৃষ্টান সম্প্রদায়ের উপর রামাযানের একমাস রোযা ফরয করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে তাঁদের জনৈক বাদশাহ অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা এ মর্মে মানত করে যে, আল্লাহ্‌ তাঁকে রোগমুক্ত করলে রোযার মেয়াদ আরো দশ দিন বাড়িয়ে দেব। এরপর পরবর্তী বাদশাহর আমলে গোস্ত খাওয়ার কারনে বাদশাহর মুখে রোগব্যধি দেখা দিলে তারা আবারো মানত করে যে, আল্লাহ্‌ যদি তাঁকে সুস্থ করে দেন তবে আমরা অতিরিক্ত আরো সাতদিন রোযা রাখব। তারপর আরেক বাদশাহ সিংহাসনে সমাসীন হয়ে তিনি বললেন, তিন দিন আর ছাড়বো কেন? এবং তিনি এও বলেন যে, এ রোযাগুলো আমরা বসন্তকালে পালন করব। এভাবে রোযা ত্রিশের সংখ্যা অতিক্রম করে পঞ্চাশের কোটায় পৌঁছে যায়

— রুহুল মাআনি, ২য় খন্ড

হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন সাওম পালন করে। তিনি জিজ্ঞাসা করালেন কি ব্যাপার? (তোমরা এ দিনে সাওম পালন কর কেন?) তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন । এ দিনে আল্লাহ্‌ তা’আলা বনী ইসরাইলকে তাঁদের শত্রুর কবল থেকে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মুসা (আঃ) সাওম পালন করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ আমি তোমাদের অপেক্ষা মুসার অধিক হকদার। এরপর তিনি এ দিন পালন করেন এবং সাওম পালনের নির্দেশ দেন

— বুখারী, সাওম অধ্যায়

 

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, হযরত মুসা ও হযরত ঈসা (আঃ) এবং তাঁদের উম্মাতগণ সকলেই সাম পালন করেছেন। নবীগণের মধ্যে হযরত দাউদ (আঃ) এর রোযা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, নবী (সঃ) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি সবসময় রোযা রাখ এবং রাতভর নামায আদায় কর। আমি বললাম জী, হ্যাঁ । তিনি বললেনঃ তুমি এরূপ করলে তোমার চোখ বসে যাবে এবং শরীর দূর্বল হয়ে পড়বে। যে ব্যক্তি সারা বছর রোযা রাখল সে যেন রোযাই রাখলনা। (প্রতি মাসে) তিনি দিন রোযা রাখা সারা বছর রোযা রাখার সমতুল্য । আমি বললাম, আমি এর চেয়ে বেশী রাখার সামর্থ রাখি। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি ‘সাওমে দাঊদী’ পালন কর। তিনি একদিন রোযা রাখতেন আর একদিন ছেড়ে দিতেন। (ফলে তিনি দূর্বল হতেন না) এবং যখন তিনি শত্রুর সম্মুখীন হতেন তখন পলায়ন করতেন না।

— বুখারী, সাওম অধ্যায়

 

এতে একথা প্রমাণিত হয় যে, হযরত দাউদ (আঃ) ও সিয়াম পালন করেছেন। মোটকথা হযরত আদম (আঃ) এর যুগ থেকেই রোযা রাখার বিধান ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে আদর্শচ্যুত হয়ে লোকেরা আল্লাহ্‌র বিভিন্ন বিধানকে যেভাবে পরিবর্তন ও বিকৃত করেছিল অনুরূপভাবে রোযার ধর্মীয় তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট্য শেষ হয়ে একটি নিছক প্রথায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
এহেন অবস্থা হতে রোযাকে রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের দিকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এবং একে অত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক কল্যাণের ধারক বানানোর নিমিত্তে মহান রাব্বুল আলামিন দ্বিতীয় হিজরিতে রামাযানের মাসের রোযাকে এ উম্মাতের উপর ফরয করে দেন।
আল্লাহ্‌ পাক ইরশাদ করেনঃ

হে ইমানদারগন! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল যাতে তোমাদের পরহেয্‌গারী অর্জিত হয়

— সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩

 

রামাযান মাস, এতে মানুষের দিশারী এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে কুরআন অবতীর্ন হয়েছে । সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে

— সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৫

 

ইসলাম অন্যানায় ইবাদতের মত রোযার মধ্যেও বেশ কিছু মৌলিক ও বৈপ্লবিক সংস্কার সাধন করেছে । সমাজের সর্বস্তরে এ সুদূরপ্রসারী সংস্কারের প্রভাব সুস্পষ্ট।
ইসলামের সর্বপ্রধান সংস্কার হল রোযার ব্যাপারে ধারনাগত পরিবর্তন। অর্থাৎ ইয়াহুদীদের দৃষ্টিতে রোযা ছিল বেদনা ও শোকের প্রতীক । ইসলাম এই হতাশাব্যঞ্জক ভ্রান্ত ধারনাকে স্বীকার করেনি।
কোন কোন প্রাচীন ধর্ম মতে রোযা এক বিশেষ শ্রেণীর জন্য পালনীয় ছিল। কিন্তু ইসলাম রোযাকে সকল শ্রেণী বিভক্তি ও সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এক সার্বজনীন রূপ দান করেছে। ইসলামের বিধানে প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের জন্য রোযা রাখা ফরজ।

 


তথ্যসূত্রঃ

ফাতাওয়া ওয়া মাসাইল (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)

Please follow and like us:
20

Comments

comments