নিজেকে যে লোকটা খুব পণ্ডিত ভাবে, বিজ্ঞান বহু বার তাকে আহাম্মক বানিয়ে দিয়েছে!

0
36

নিজেকে যে লোকটা খুব পণ্ডিত ভাবে, বিজ্ঞান বহু বার তাকে আহাম্মক বানিয়ে দিয়েছে!

নিজেকে যে লোকটা সবজান্তা মনে করে, বিজ্ঞান বহু বার তাকে মূর্খ প্রমাণ করেছে!

নিজেকে যে লোকটা খুব চালাক-চতুর মনে করে, বিজ্ঞান বহু বার তাকে ঠকিয়ে দিয়েছে!

আর এ বারও তাই ঘটল। একেবারে তিন-তিনটি গো..ও..ও..ও..ল!

একেবারে হালের তিন-তিনটি গবেষণায়। পৃথিবীর তিন প্রান্তে তিনটি গবেষণার ফলাফল ইংরেজি অভিধানের তিন-তিনটি ফ্রেজ/ইডিয়ামকে (প্রবাদ, প্রবচন) একেবারেই ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। আর এই ভাবেই আমাদের বহু দিনের বহু ধারণা আর অভ্যাসকে একেবারে আমূল বদলে দিতে পেরেছে বিজ্ঞান। অনেক বদ্ধমূল বিশ্বাসের মূলে সজোরে নাড়া দিয়েছে।

বিরলতম ঘটনা বোঝাতে আমরা ইংরেজিতে এত দিন বলে এসেছি, এখনও বলে চলেছি, ‘ওয়ান্স ইন আ ব্লু মুন’!

ওই প্রবচনের মাধ্যমে আমরা বোঝাতে চাই এমন কোনও ঘটনা, যা প্রায় ঘটে না বললেই চলে।

ইংরেজি শব্দ, প্রবাদ, প্রবচনের ঠিকুজি-কোষ্ঠি ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, এই ইংরেজি প্রবচনটির ব্যবহার হচ্ছে ১৫২৮ সাল থেকে। একেবারেই যে তা গাছ থেকে পড়েছিল, তা কিন্তু নয়! ইউরোপ-আমেরিকায় বিকেলে খেত থেকে ধান তুলে তার গোড়াটা জ্বালিয়ে দিতেন কৃষকেরা। সেই দাউ দাউ আগুনের কালো ধোঁয়ায় তাঁরা যখন আকাশে সদ্য ওঠা চাঁদের দিকে তাকাতেন, তখন তাঁরা দেখতেন, ‘ব্লু মুন’। নীলাভ চাঁদ। আর তা তো রোজ রোজ হত না। ধান তোলার মরশুমেই এক সঙ্গে অনেক ধান তোলার পর, তার গোড়া কেটে আগুন জ্বালালেই আকাশে সদ্য ওঠা চাঁদের রং বদলে ‘নীল’ হয়ে যেত! তাই, এক অর্থে, সেটা তো কিছুটা বিরল ঘটনাই বটে!


কে বলল বিরলতম? নীল চাঁদ!

কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, ‘নীল চাঁদ’ খুব একটা বিরল নয়। বিরলতম তো নয়ই। প্রতি ২০/২১ মাস পর পর সেটা ঘটে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী বলেন ‘‘যে মাসে দু’টো অমাবস্যা থাকে, তাকে আমরা ‘মল মাস’ বলি। তেমনই ২০/২১ মাস পর পর এমন একটা মাস আসে, যে মাসে দু’টো পূর্ণিমা থাকে। আর সেই মাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমাটাই হয় ‘ব্লু মুন’। এক একটি চান্দ্রমাস হয় সাড়ে ২৯ দিনে। তার জন্য একটি পূর্ণিমা থেকে পরের পূর্ণিমাটি দেড় দিন করে এগিয়ে আসে। এই ভাবেই প্রতি ২০/২১ মাস অন্তর (মাসের ৩০ দিনকে দেড় (১.৫) দিয়ে ভাগ করলে ২০/২১-এর কাছাকাছি হয়) দু’টি পর্ণিমা একই মাসে এসে পড়ে। তবে চাঁদের রং নীলচে লাগার কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ রয়েছে। কোনও ভয়ঙ্কর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের ফলে বাতাসে যে ধুলোকণা মেশে, তাদের আকার যদি ০.৭ মাইক্রনের চেয়ে বড় হয়, তা হলে তাদের মধ্যে দিয়ে চাঁদকে আলোর নীল তরঙ্গ-দৈর্ঘ্যেই দেখা যাবে। সোজা কথায়, চাঁদকে তখন নীলাভই দেখতে লাগবে।’’

 

আরও আছে। আরও ভুলচুক আছে ইংরেজি প্রবাদ ও প্রবচনে।

ওই সব ভুলচুক নিয়েই কয়েকশো বছর ধরে বেঁচেবর্তে রয়েছে ইংরেজি প্রবাদ ও প্রবচনগুলো। জেনে অথবা না-জেনে সেগুলো আমরা এখনও ব্যবহার করে চলেছি।  কিন্তু, হালের বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল যা জানাচ্ছে, তাতে হয়তো এ বার সেই সব ভুলচুক বদলে নিতে হবে খুব শীঘ্রই।

যেমন- ‘অ্যাজ ব্লাইন্ড অ্যাজ ব্যাট’।

যার মানেটা হল, বাদুড়ের মতো অন্ধ! আসলে কথাটা আমরা ব্যবহার করি এটা বোঝাতে যে, চোখে পড়লেও, অনেক কিছুই যার নজরে পড়ে না। দেখেও, না-দেখা গোছের অবস্থা! কেউ কারও গভীর প্রেমে পড়লে যেমন প্রেমিক বা প্রেমিকা একে অপরের দোষ-ত্রুটিগুলো নজরে আনেন না! নজরে আনতে চান না! খুব পুরনো ইংরেজি প্রবচন। কয়েকশো বছরের পুরনো। প্রায় একই রকমের মন্তব্য করেছিলেন অ্যারিস্টটল। তাঁর মন্তব্যটি ছিল- “For as the eyes of bats are to the blaze of day, so is the reason in our soul to the things which are by nature most evident of all.”। এর মানেটা হল, তা সে ইংরেজি প্রবচনই হোক বা, অ্যারিস্টটলের মন্তব্য, সেই সময় এটা কারও জানা ছিল না, বাদুড় মোটেও অন্ধ নয়! কেউই তখন জানতেন না, বাদুড় ভালই দেখতে পায়!


তিনি মোটেই অন্ধ নন! বাদুড়।

কিন্তু প্রাণীবিজ্ঞানের আধুনিক গবেষণা যা বলছে, তাতে ওই ইংরেজি প্রবচনটি যাঁরা বানিয়েছিলেন বা অ্যারিস্টটল, তাঁদের সকলেরই চমকে যাওয়া উচিত! একেবারে হালে, মে মাসে বিজ্ঞান-জার্নাল ‘ডিসকভার’-এ প্রকাশিত হয়েছে একটি গবেষণাপত্র। তাতে দাবি করা হয়েছে, বাদুড় মোটেই অন্ধ নয়। বরং তার দৃষ্টিশক্তি যথেষ্টই শক্তিশালী। নজর কাড়ার মতো!

মূল গবেষক তাইওয়ানের চুং সিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক প্রদীপ্ত কুণ্ডুর কথায়, ‘‘আমরা দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা চালিয়ে দেখেছি, বাদুড় মোটেই অন্ধ নয়। তারা দিনের আলোয় ভালই দেখতে পায়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিশক্তি আমাদের চেয়েও ভাল।  আমরা দেখেছি, শক্তিশালী দৃষ্টিশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় আলোক-সংবেদী প্রোটিন ‘অপসিন’-এর ভূমিকা দিন ও রাতের বিভিন্ন সময়ে আমূল বদলে যায় বাদুড়দের ক্ষেত্রে। তার মানে, তাদের ইচ্ছেমতো দৃষ্টিশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বাদুড়। শুধু তা-ই নয়, আমরা এটাও দেখেছি, একটি বিশেষ প্রজাতির বাদুড়ের দৃষ্টিশক্তি রীতিমতো শক্তিশালী। ওই বিশেষ প্রজাতির বাদুড়ের নাম- ‘মেগা-ব্যাট্‌স’। এরা খুব ভোরে বা সন্ধ্যা নামার মুখে তাদের খাবারের খোঁজে শিকার করতে নামে। তার মানে, খুব ভোরে বা সন্ধ্যা নামার মুখে যখন সূর্যের আলো থাকে, তখন তারা ভালই দেখতে পায়। না-দেখতে পেলে, তারা ওই সময় দু’টিকে তাদের শিকারের জন্য বেছে নিত না।’’

সেই ইংরেজি প্রবচনটির কথা মনে আছে তো আপনার?

‘আ লেপার্ড নেভার চেঞ্জেস ইট্‌স স্পট্‌স’!


সে-ও বদলে যায়, বদলে যায় তার দাগ! চিতাবাঘ।

যার মানেটা হল, কোনও বদ স্বভাবের মানুষ, বদলে যাওয়ার হাজারো ভনিতা করলেও, সে কোনও দিনই বদলে যায় না। মানে, তার স্বভাবগুলো আদৌ বদলায় না।

কথাটা প্রথম এসেছিল ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ (জের. ১৩: ২৩) থেকে। হিব্রু ধর্মগুরু জেরেমিয়া এক দুষ্ট মেষপালিকাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে ভাল করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অনেক দিন চেষ্টা করার পর জেরেমিয়া যখন বুঝলেন, সেটা আদৌ সম্ভব নয়, তখন এক দিন খুব রেগে গিয়ে তিনি বললেন, ‘‘কোনও ইথিওপিয়ানের (ইথিওপিয়ার মানুষ) চামড়া কি বদলানো যায়? বদলানো যায় কি চিতাবাঘের গায়েক দাগ?’’

কিন্তু বিজ্ঞানের হালের গবেষণা জানাচ্ছে, জেরেমিয়া চিতাবাঘের উপমাটা না দিলেই ভাল করতেন! আসলে যে সময়ে দাঁড়িয়ে জেরেমিয়া কথাটা বলেছিলেন, সেই সময় মানুষ সেটাই জানতেন। বিশ্বাস করতেন, চিতাবাঘের গায়ের দাগ কখনওই বদলায় না।

বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল জানাচ্ছে, চিতাবাঘের গায়ের চাকা চাকা দাগও বদলে যায়। আর তা এক বারই বদলায় চিতাবাঘের আয়ুষ্কালে। বার বার বদলায় না। তার মানে, চিতাবাঘের গায়ের দাগ তার আয়ুষ্কালে কখনওই বদলায় না, এ কথাটা একেবারেই ভুল।

এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান-জার্নাল ‘জুলজি’-তে। মূল গবেষক তাইওয়ানের চুং সিং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক প্রদীপ্ত কুণ্ডু বলছেন, ‘‘চিতাবাঘ নিজের ইচ্ছেমতো তার গায়ের দাগ বদলে নিতে পারে না। কিন্তু, তাদের আয়ুষ্কালের কোনও একটি সময়ে, কোনও একটি পর্যায়ে এসে তাদের গায়ের দাগগুলো আপনাআপনি বদলে যায়। আমূল। বড় বড় দাগগুলো ছোট হয়ে যায়। ছোট দাগগুলো হয়ে যায় বড়। একেবারে প্রাকৃতিক নিয়মেই। ‘ফাদার অফ কম্পিউটিং’ অ্যালান ট্যুরিং-এর কাজের ভিত্তিতেই গবেষণা চালিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি। কোনও রঞ্জক পদার্থ (ডাই) আমাদের চামড়ায় ছড়িয়ে পড়লে, কী ভাবে তা থেকে একই রকমের চাকা চাকা দাগ তৈরি হয়, তার একটা গাণিতিক মডেল দিয়েছিলেন ট্যুরিং। আমরা সেই মডেলটাকেই আরও উন্নত করে দেখেছি, চিতাবাঘ আর চিতাদের গায়ের দাগগুলো তাদের আয়ুষ্কালে এক বার আমূল বদলে যায়। এক বারই বদলায়। আর সেটা চিতাবাঘ বা চিতার ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না।’’

Please follow and like us:
20

Comments

comments

%d bloggers like this: