কেন এত অবহেলা?

0
7
কেন এত অবহেলা

শ্রীনিভাস গাজীপুরের কোনাবাড়ি এলাকার বর্ণমালা আইডিয়াল স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্র ছিল। গত বুধবারের ঘটনা। স্কুল থেকে কোচিং শেষে সহপাঠী আরিফ, রাকিব, সজল ও শাওনের সঙ্গে শ্রীনিভাস জরুন পূর্বপাড়া এলাকায় খেলতে যায়। সেখানে ড্রেজার দিয়ে একটি জলাশয় ভরাটের কাজ চলছিল। পাইপ দিয়ে যেখানে বালুমিশ্রিত পানি পড়ছিল, সেখানে তারা খেলা করতে নামে। একপর্যায়ে শ্রীনিভাস ও আরিফ বালুমিশ্রিত পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। এ সময় আরিফ উঠে আসতে পারলেও শ্রীনিভাস তলিয়ে যায়। পরদিন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তার লাশ উদ্ধার করেন। অনেকেই এ ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বলেই অভিহিত করবেন। কিন্তু আসলেই কি এটি দুর্ঘটনা? চাইলে কি এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত না? নিশ্চয়ই যেত। যারা জলাশয় ভরাটের কাজে নিয়োজিত ছিলেন, তাঁরা যদি সে সময় ওই এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করতেন, জলাশয়ের আশপাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতেন, তাহলে শিশুরা সেখানে খেলতে যেত না আর অকালে মৃত্যুবরণ করতে হতো না শ্রীনিভাসকে।

এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ বন্দরে সিটি করপোরেশনের রাস্তা নির্মাণের জন্য ড্রেজার দিয়ে বালু ভরাটের জমানো পানিতে ডুবে রাহাত হোসেন নামের ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। রাহাতের ঘটনা থেকে গাজীপুরের জলাশয় ভরাটের কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারেরা সতর্ক হতে পারতেন। তাঁরা সেখানে শিশুদের আসা নিষিদ্ধ করতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেননি।

এটা ঠিক যে দুর্ঘটনার ওপর মানুষের হাত নেই। কিন্তু মানুষের অবহেলার কারণে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে, তা মেনে নেওয়া যায় না। শিশু জিহাদের মৃত্যুর কথা নিশ্চয়ই পাঠকেরা ভুলে যাননি। ২০১৪ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির মাঠে পরিত্যক্ত পানির পাম্পের পাইপে পড়ে গিয়ে চার বছর বয়সী শিশু জিহাদের মৃত্যু হয়। ওই পানির পাম্পের পাইপের মুখে কোনো ঢাকনা ছিল না। খেলার একপর্যায়ে শিশু জিহাদ ওই পাইপে পড়ে যায়।

শুধু শিশুরাই নয়, অবহেলার কারণে নানা দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন বড়রাও। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তরায় একটি ফ্ল্যাটে গ্যাসের আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন স্বামী-স্ত্রীসহ একই পরিবারের চার সদস্য। গত মার্চে বনানীতে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় ২০টি পরিবারের বাসস্থান। এ দুটি দুর্ঘটনার পেছনে ছিল কারও না কারও অবহেলা ও গাফিলতি। রেলকর্মীদের অবহেলার কারণে প্রতিবছর অসংখ্য রেল দুর্ঘটনা ঘটছে। মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে বহু মানুষকে। লঞ্চের মালিক, চালক ও শ্রমিকদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে ঘটছে লঞ্চডুবির ঘটনা। চালকের দায়িত্বে অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা তো পত্রিকার পাতার নিয়মিত খবরে পরিণত হয়েছে।

কেন এত অবহেলা, এত গাফিলতি? এর পেছনে কি বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে? কারণ তো রয়েছেই। অবহেলা বা গাফিলতির কারণে এত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটলেও কারও দৃষ্টান্তমূলক কোনো শাস্তি হয় না। দায়িত্বে অবহেলা একধরনের অপরাধ। কিন্তু এই অপরাধের যদি শাস্তি না হয়, তাহলে অবহেলা করতে দোষ কী! শাস্তি না হওয়ায় অবহেলা করাটা আমাদের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে।

Please follow and like us:
20

Comments

comments