গরু ও মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর

0
121

ঢাকা, ২৮ জুলাই- সামনে পবিত্র ঈদুল আযহা। এ দিনে মুসলমানরা তাদের সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা কিংবা ছাগল কোরবানি দেয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমানরা সাধারণত গরু কোরবানি করেন। তাই এদেশে গরুর চাহিদাও অনেক। এ সুযোগে দাম বেশি পাওয়ার জন্য এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে গরু মোটাতাজা করেন। যা গরু এবং মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরু মোটাতাজাকরণ বলতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উন্নত এবং সুষম খাবার সরবরাহ এবং বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঐ গরুর শরীরে অধিক পরিমাণ গোস্ত বা চর্বি বৃদ্ধি করে বাজারজাত করাকেই বুঝায়। বয়সের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ৯০ দিন বা ৩ মাসের মধ্যে গরু মোটাতাজাকরণ করা যায়। তবে অনেক সময় পরিস্থিতিভেদে ১২০-১৪০ দিনও সময় লাগতে পারে।

তারা বলছেন, উন্নত এবং সুষম খাবারের পদ্ধতি বাদ দিয়ে স্টেরয়েড বা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে যদি গরু মোটাতাজাকরণ করা হয় তাহলে ঐ গরুর মাংস খাওয়ার ফলে মোটাতাজাকরণের ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থ মানব দেহে ঢোকে। এতে মানুষের কিডনি, লিভার, হৃৎপিণ্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ মানুষের শরীরে বেশি মাত্রায় জমা হলে মানুষের বিপাক ক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে স্টেরয়েড বা রাসায়নিক পদার্থ গরুর জন্যও ক্ষতিকারক। এটা ব্যবহারে গরুর কিডনীতে সমস্যা হয়, শরীর ফুলে যায়। মাংসে চাপ দিলে ওই অংশে ডেবে যায়। বেশী মাত্রায় প্রয়োগ করলে গরু মারাও যেতে পারে।

এ বিষয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোঃ মোফাজ্জল হোসাইন বলেন, ‘গরু মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তি। তিন থেকে চার মাসের মধ্যে খাবারের মাধ্যমেই মোটাতাজাকরণ করা হয়। এটি কোনো জাদু নয়। একটি প্রযুক্তি দিয়ে হয়। নির্দিষ্ট খাবার খাওয়ানো হয়। তিন মাস পরে গরু স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। সেই মাংসটা সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যের জন্যও ভাল।’

তিনি বলেন, ‘তবে স্টেরয়েড বা গরুর জন্য যেগুলো নিষিদ্ধ ওষুধ সেগুলো ব্যবহার করার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে গতবছর। স্টেরয়েড ব্যবহার করলে গরু ফুলে যায়। অনেক মোটা হয়ে যায়। এই গরু দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মারাও যায়। যদি এটা কোরবানি ঈদে জবাই না করা হত, সে গরু এমনিতেই মারা যেত, অতিরিক্ত স্টেরয়েড ব্যবহার করার কারণে এবং সেই গরুর মাংশ খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে।’

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কালাম আজাদ বলেন, স্টেরয়েড ও ডেক্সামেথাথন জাতীয় ওষুধ গরুর শরীরের কোষকে দ্রুত বিবাজিত করে। অনেক ক্ষেত্রে কোষে পানির পরিমাণ বেড়ে যায়। গরু মোটা দেখালেও প্রকৃতপক্ষে এসব গুরুর মাংসের গুণগতমান অনেক কম। ওই সব ওষুধ ব্যবহারের ফলে তা সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগে জবাই করার ফলে তা গরুর শরীরে থেকে মানুষের শরীরে ঢুকে অনাকাক্ষিত বৃদ্ধি, কিডনি, লিভারসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঙ্গে নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে।

এ বিষয় নিয়ে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এক গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে। যাতে উপস্থিত ছিলেন, পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব চিকিৎসক লেলিন চৌধুরী, পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান, অধ্যাপক আবু সাঈদ, পুষ্টি তত্ত্ববিদ সুমাইয়া ইসলাম, বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য বিষয়ক জাতীয় কমিটির সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, কোরবানি উপলক্ষে অধিক মুনাফার লোভে গরু মোটাতাজাকরণে বিভিন্ন ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব ওষুধ ও রাসায়নিকের প্রভাবে গরুর শরীরে পানি ও তরল পদার্থ জমা হতে শুরু করে। দ্রুত গরুকে মোটা দেখাতে থাকে। এই গরু বেশি দিন বাঁচে না। অস্বাভাবিকভাবে মোটা করা এই সব গরু দেখতে নির্জীব ও গতি শ্লথ হয়ে যায়। এদের ঘন ঘন শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে হয়। আচরণে অত্যন্ত ক্লান্ত ভাব দেখায়।

তারা আরও বলেন, অতি লাভের জন্য কিছু অসাধু মানুষের কার্যকলাপে কোরবানির গরুর মাংস মানুষের, বিশেষভাবে শিশু ও গর্ভবতী নারীর জন্য প্রতিবছর দুঃখজনক পরিণতি বয়ে আনছে। এ ধরনের অপরাধ হচ্ছে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মানব জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এই সব কর্মকাণ্ড থামানো এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। জনসাধারণকেও দেখতে মোটাতাজা, কিন্তু নির্জীব, শ্লথ ও ক্লান্ত দেখাচ্ছে এ ধরনের গরু কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে।

DATE-28/7/2017

Please follow and like us:
20

Comments

comments