তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ

0
4
তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ
তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ

 তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ

তসলিমা নাসরিন-

তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ
তসলিমা নাসরিন- মেয়েদের আত্নহত্যা প্রসঙ্গ
তসলিমা নাসরিন
মানসিক রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেশি কিন্তু রোগটি না থাকলেও কিন্তু মানুষ নানা কারণে আত্মহত্যা করে। জাপানে এককালে হারাকিরি আত্মহত্যার চল ছিল। পরাজিত সৈন্যরা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পন না করে বরং হারাকিরি করতো। শুধু সৈন্যরা নয়, সাধারণ মানুষও করতো হারাকিরি। অনেকে করতো প্রতিবাদে। হারাকিরিটা বীভৎস বটে। নিজের হাতে ধারালো ছুরি নিজের পেটে ঢুকিয়ে দেওয়া। হারাকিরিকে বেশ সম্মানের চোখেই দেখা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি কামিকাজি পাইলটরা শত্রুপক্ষের ওপর যুদ্ধবিমান ক্রাশ করতো। কিছু শত্রু এবং শত্রু সম্পত্তি ধ্বংসের জন্যই ছিল ওই আত্মহত্যা। জাপানে ফুজি পাহাড়ের কাছে আওকিগাহারা নামের একটি জঙ্গল আছে। এই জঙ্গলে মানুষ যায় আত্মহত্যা করতে। জঙ্গলটার নামই হয়ে গেছে আত্মহত্যার জঙ্গল। ওই জঙ্গলটায় জাপানিরা এককালে বুড়ো-মহিলাদের, সংসারে যাদের আর দেওয়ার কিছু নেই, রেখে আসতো। খাদ্য আর জল না পেয়ে একসময় মহিলারা মারা যেত। উনিশশ’ ষাট সালে ‘কুরোই জুকাই’ নামের একটি উপন্যাস লিখেছিলেন সেইচো মাৎসুমটো। মাৎসুমটো লিখেছেন কিকরে উপন্যাসের নায়ক আওকিগাহারা জঙ্গলে গিয়ে আত্মহত্যা করে। উপন্যাসটি বেশ জনপ্রিয় জাপানে। এটি জনপ্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওকিগাহারা জঙ্গলও আত্মহত্যার জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রতি বছর প্রায় একশ মৃতদেহ ওই জঙ্গলে পাওয়া যায়।
আত্মহত্যাটা কি সংক্রামক? ভারতে যে হারে পুরুষ-কৃষকরা আত্মহত্যা করে, দেখে তো মনে হয় আত্মহত্যাটা সংক্রামক।
ইহুদি, খ্রিস্টান আর মুসলমানরাই আত্মহত্যাকে মেনে নেয়নি, ঈশ্বরের দেওয়া প্রাণকে হত্যা করা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে একরকম ঔদ্ধত্য বলেই বিবেচনা করা হয়। তারপরও কিন্তু ওই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে আত্মহত্যা নেহাত কম নয়। পৃথিবীতে আট-নয়’ লাখ মানুষ অথবা তারও চেয়ে বেশি প্রতিবছর আত্মহত্যা করে। নারীর চেয়ে পুরুষরাই অবশ্য বেশি করে। ভারতীয় নারীদের বেশিরভাগই করে অপমানে আর অভিমানে। উপমহাদেশেই বোধহয় সিলিং ফ্যানে দড়ি বেঁধে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেশি।
আমি মনে করি, আত্মহত্যার অধিকার মানুষের থাকা উচিত। জন্মের পর বেঁচে থাকার যেমন অধিকার আছে, মরে যাওয়ারও অধিকার আছে। ইউদেনেশিয়াকে, মুমূর্ষু মানুষের স্বেচ্ছামৃত্যুকে, কিছু দেশে, বিশেষ করে খ্রিস্টানঅধ্যুষিত দেশে বৈধ করা হয়েছে। স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ হওয়া মানে ধর্মের রক্তচক্ষুকে একরকম ভয় না পাওয়া।
আমি ইওদনেশিয়া সমর্থন করি। দীর্ঘকাল যে মানুষ যন্ত্রণা পাচ্ছে, যার রোগ শোক কোনওদিন আর সারবে না, যার শরীর তো বিকলই, মস্তিস্কও বিকল, তার মৃত্যুতে আমার কষ্ট হয় না। কিন্তু সুস্থ তরুণ-তরুণীর আত্মহত্যার খবর শুনে আমি কষ্ট পাই। দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু হলে যেমন কষ্ট পাই, কেউ নিহত হলে যেমন পাই, তেমনই কষ্ট পাই মানুষের আত্মহত্যায়। বলিউডের নায়িকা জিয়া খান, হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা প্রত্যুষা ব্যানার্জি আত্মহত্যা করেছিল যে কারণে, সে কারণে সেদিন বাংলাদেশের মডেল সাবিরা হোসাইনও আত্মহত্যা করেছে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে অনেক মেয়েই আত্মহত্যা করে। প্রেমিক অপমান করেছে, বা প্রতারণা করেছে, সুতরাং বেঁচে থাকার, তারা মনে করে না, কোনও প্রয়োজন আছে। সমস্যার সমাধান সাধারণত তারা এভাবেই করে। এমনই তুচ্ছ, তারা বিশ্বাস করে, তাদের নিজের জীবন।
চলচ্চিত্রে অভিনয় করলে, বা নাটক থিয়েটার করলে, বা মডেলিং করলেই মন-মানসিকতা আধুনিক হয় না। সুচিত্রা, শাবানা, ববিতা, রাজ্জাক, অমিতাভ এবং আরও অনেক তারকাই ধর্মান্ধতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, আর কুসংস্কারে ডুবে ছিলেন এবং আছেন। পুরুষের সঙ্গে সংসার না করলে জীবন অর্থহীন হয়ে যায়, বা সন্তান জন্ম না দিলে নারীর জীবনের কোনও মূল্যই থাকে না—এগুলোকে বিশ্বাস করে শিক্ষিত নয়, অশিক্ষিত মানুষ। শোবিজে অশিক্ষিতর সংখ্যা নেহাত কম নয়।
প্রেমিকের প্রতারণার সবচেয়ে বড় শিকার তারা, যারা পতিতাবৃত্তি করতে বাধ্য হচ্ছে। প্রেমিকপুরুষগুলো তাদের ছলে বলে কৌশলে বিক্রি করে দিয়েছে পতিতালয়ে। চরম দুঃসহবাসেও তারা আত্মহত্যা করে না। বরং নিজেকে নয়তো নিজের সন্তানকে নরক থেকে বাঁচাবার জন্য জীবনভর লড়াই করে। আমি বলতে চাইছি না আত্মহত্যার অধিকার মানুষের নেই। জন্মের পর বেঁচে থাকার যেমন অধিকার আছে, মরে যাওয়ারও অধিকার আছে। তবে অকারণে মরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। যত যাই ঘটুক জীবনে, জীবনের চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই।
আমি এমন দেখেছি অনেক, প্রেমে পড়লেই মেয়েরা বড় দুর্বল, বড় ক্ষুদ্র, বড় মূল্যহীন, বড় অকিঞ্চিৎকর, বড় অপ্রতিভ, বড় অবলা, বড় অসহায় হয়ে ওঠে। আত্মসম্মানবোধ লোপ পায়। হয় প্রেমের সংজ্ঞা পাল্টাক, নয়তো মেয়েরা পাল্টাক। প্রেম বলতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যা বোঝে, তা ঠিক প্রেম নয়। পুরুষকে ভালোবাসা মানে পুরুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করা, নারীকে ভালোবাসা মানে নারীকে নিরাপত্তা দেওয়ার নামে দেখভাল করা, খবরদারি করা। এ আর যাই হোক, প্রেম নয়। প্রেমের সংজ্ঞা নতুন করে রচনা করতে হবে মেয়েদেরই। অবশ্য মেয়েরা পাল্টালেই তো সমাজ পাল্টাবে না, পুরুষরা যতক্ষণ না পাল্টাবে, পুরুষতন্ত্রের ওপর আঘাত যতক্ষণ তারা না করবে, ততদিন পুরুষতন্ত্র রচিত প্রেমের সংজ্ঞাও ঠিক এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে থাকবে।
পুরুষেরা তো পুরুষের জন্য নারীর প্রেম ঠিক কী রকম হওয়া চাই তা বলেই দিয়েছে। পুরুষহীন নারীর জীবন মূল্যহীন। তাই পুরুষ মারা গেলে নারীকেও মরতে হবে। সতীদাহ প্রথাই তো বড় উদাহরণ। যে নারী মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে নারী সতী, অর্থাৎ সে নারী পুরুষকে সত্যিকার ভালোবাসে। সতীদাহ প্রথা ব্রিটিশ রাজ নিষিদ্ধ করেছে বটে, তবে কী করে নারী তার পুরুষকে ভালোবাসবে, সেটি কিন্তু এখনও পুরুষের মনে ও মস্তিস্কে একইভাবে গেঁথে আছে। নারীও সংক্রামিত হয় প্রেমের পুরুষতান্ত্রিক সংজ্ঞায়। সতীদাহ’র চর্চা সমাজে নেই বটে, তবে আগুন এখনও আছে, যে আগুনে নারীরা জেনে বা না-জেনে আজও পুড়ছে। এখনও সমাজ সেই নারীকে সতী বলে, আদর্শ নারী বলে, যে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পুরুষের স্বার্থরক্ষা করে, যে নারী নিজের সাধআহলাদ বিসর্জন দিয়ে পুরুষের সাধআহলাদ মেটায়, যে নারী পুরুষের সংসারে পুরুষের আদেশ নিষেধ মান্য করে একধরনের দাসিবৃত্তি করে। পুরুষের অবহেলা পেলে জীবন অর্থহীন হয়ে যায় সেসব নারীর, আত্মহত্যা করতে বাধে না। সতীদাহ’র আগুন আজকাল দেখা যায় না। তবে গভীর করে দেখলে যে কেউ বুঝবে, সেই প্রাচীন কালের সতীদাহের চর্চাই চলছে ঘরে ঘরে।
প্রেমিক-পুরুষ না থাকলে, বা স্বামী-পুরুষ না থাকলে নারীর জীবন অর্থহীন এবং মূল্যহীন—এই ভাবনাটা নারীর মস্তিস্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেই যেভাবে সেকালের নারীরা স্বামীর চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়তে বাধ্য হতো, ঠিক একইভাবে একালের মেয়েরা, সাবিরা হোসাইনরা, আত্মহতা করতে গলায় দড়ি বাঁধে বা বাঁধতে বাধ্য হয়।

Save

Please follow and like us:
20

Comments

comments