নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী শেষ পর্যন্ত পুরস্কার অধরাই থেকে গেল

0
10
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী

নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী 

শান্তিতে কেন নোবেল পাননি মহাত্মা গান্ধী?
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী
মহাত্মা গান্ধী

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের কিংবদন্তি নায়ক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী বা মহাত্মা গান্ধী। এই রাজনীতিবিদ ছিলেন সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। অহিংস মতবাদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এ আন্দোলন ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চালিকা শক্তি। তবে ভারতের স্বাধীনতার ৬০ বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখনও শান্তিতে নোবেল জোটেনি এই রাজনীতিকের। অথচ পুরো দুনিয়াজুড়ে এখনও শান্তি ও অহিংস নীতির এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। ফলে সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এখনও কেন তাকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়নি?

। এনোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য পাঁচবার মনোনীত হয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধীমনকি তিনবার শর্টলিস্টেও ছিল তার নাম। তবে শেষ পর্যন্ত পুরস্কার অধরাই থেকে গেছে।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নরওয়ের ইতিহাসবিদ ওইভিন্দ স্টেনারসেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে তিনি বলেন, ভারতীয় নাগরিক কৈলাস সত্যার্থীকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করাটাও ছিল এ সংক্রান্ত কমিটির একটি স্মার্ট পরিবর্তন।

তিনি বলেন, মহাত্মা গান্ধী এ পুরস্কার না পাওয়ায় ব্যাপারটি নিয়ে সবসময়ই একটা অপরাধবোধ ছিল। আমরা জানি, ব্যাপারটি নিয়ে কিছু সময়ের জন্য হলেও ইন্ডিয়ানদের শান্ত করতে তারা একজন ভারতীয়কে খুঁজছিল।

মহাত্মা গান্ধী কেন কখনোই লোভনীয় এই পুরস্কারে ভূষিত হননি নিজেদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে অবশ্য তার একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে নোবেল শান্তি পুরস্কার কর্তৃপক্ষ।

১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মতো নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য অন্যদের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীকেও মনোনীত করা হয়। তবে ওই সময়ে গান্ধী সম্পর্কে নির্বাচক কমিটির উপদেষ্টা জ্যাকব ওর্ম-মুলার-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতিবাচক।

জ্যাকব ওর্ম-মুলার বলেছিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি একজন ভালো, বুনিয়াদি ও তপস্বী ব্যক্তি। ভারতজুড়ে গণমানুষের কাছে সম্মানিত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মানুষ তাকে ভালোবাসে। তার গৃহীত পদক্ষেপগুলো ছিল নিখুঁত। ফলে তার অনুসারীরা সহজেই সন্তোষজনকভাবে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, একজন একনায়ক, একজন চিন্তাশীল এবং একজন জাতীয়তাবাদী। যীশুর মতো প্রতীয়মান হলেও হঠাৎ করে তিনি একজন সাধারণ রাজনীতিকে পরিণত হন।

জ্যাকব ওর্ম-মুলার বলেন, আন্তর্জতিক অঙ্গনে শান্তি আন্দোলনে গান্ধীর বহু সমালোচনা রয়েছে। তিনি ধারাবাহিকভাবে শান্তিকামী ছিলেন না। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তার অহিংস প্রচারণা সহিংসতা ও সন্ত্রাসের মধ্যে অবক্ষয়িত বা স্বধর্মচ্যুত হয়েছিল।

মহাত্মা গান্ধীকে ও অতিমাত্রায় জাতীয়তাবাদী মনে করতেন জ্যাকব ওর্ম-মুলার। তার ভাষায়, কেউ হয়তো বলবেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকায় তার সংগ্রাম তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সেটা ছিল শুধু ভারতীয়দের পক্ষে। এটা সেখানকার কালোদের পক্ষে ছিল না যাদের জীবনযাত্রা ছিল আরও খারাপ।

নিজের এমন বক্তব্য জোরালোভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারের নির্বাচকমণ্ডলীর কমিটিতে তুলে ধরেন জ্যাকব ওর্ম-মুলার। একটি নোবেল কমিটিতে এমন বক্তব্যও এসেছে যে, গান্ধী একজন সত্যিকারের রাজনীতিক ছিলেন না, প্রাথমিক পর্যায়ের একজন মানবিক ত্রাণ কর্মীও ছিলেন না, আন্তর্জাতিক পিস কংগ্রেসেরও সংগঠক ছিলেন না।

১৯৩৭ সালের পর ১৯৩৮ এবং ১৯৩৯ সালেও তিনি পুনরায় নোবেল শান্তি পুরস্কারে মনোনীত হন। এরপর ১৯৪৭ সালেও সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও স্থান পান তিনি। তবে সেবারও কমিটিতে মহাত্মা গান্ধীর ব্যাপারে আপত্তি তোলা হয়। সেবার নোবেল শান্তি কমিটির উপদ্ষ্টো জেন্স অরুপ সেইপ গান্ধীর ব্যাপারে নিজের অসম্মতির কথা জানান। অবশ্য তার বিরোধিতা জ্যাকব ওর্ম-মুলার-এর শক্তিশালী ছিল না।

শান্তিতে নোবেল নিয়ে বিতর্ক যে শুধু এক মহাত্মা গান্ধীকে নিয়েই; এমন নয়। ৭ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস-এর নাম ঘোষণা করে নরওয়ের নোবেল কমিটি। তবে নাম ঘোষণা করতে না করতেই বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক-সমালোচনার সূত্রপাত ঘটে।

চার বছর ধরে আলোচনার পর গত সেপ্টেম্বরে ফার্ক বিদ্রোহীদের সঙ্গে কলম্বিয়া সরকারের শান্তিচুক্তি হয়। চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য কলম্বিয়ার জনগণের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। আর সেই প্রশ্নে জনগণের রায় জানতে গণভোট আয়োজন করা হলেও তার রায় শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষে যায়নি। কলম্বিয়ার জনগণ গণভোটে শান্তিচুক্তির বিপক্ষে রায় দিয়েছিলেন। অথচ ওই শান্তিচুক্তির জন্যই ৭ অক্টোবর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঘোষণা করে নরওয়ের নোবেল কমিটি।

যে চুক্তিকে জনগণ গ্রহণ করেনি সেই চুক্তির জন্য সান্তোসকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার জনগণকে অপমান করা হচ্ছে কিনা তা নোবেল কমিটির কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা। পাশাপাশি তারা আরও জানতে চান, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ফার্ক নেতা দুজনই মনোনীত হওয়ার পরও কেন কেবল সান্তোসকেই নোবেল দেওয়া হলো?

প্রথম প্রশ্নের জবাবে নোবেল কমিটির মুখপাত্র দাবি করেন, এর মধ্য দিয়ে কলম্বিয়ার জনগণকে অসম্মান করা হয়নি বরং এটি দেশটির জনগণের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, ‘গণভোটে শান্তিচুক্তির বিপক্ষে রায় আসলেও মূলত ওই আলোচনার কারণেই কলম্বিয়ার রক্তাক্ত সংঘাত শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছে।’ তার মতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সান্তোসের প্রয়াস আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছেকেই প্রতিফলিত করে।

শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রায় ৫২ বছরের রক্তাক্ত সংঘাতের ইতি টেনেছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস এবং ফার্ক বিদ্রোহী নেতা রদ্রিগো লোন্দোনিও তিমোশেঙ্কো। সম্ভাব্য তালিকায় তাদের দুজনের নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার জিতেছেন হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস। কেন তাদের দুজনের মধ্যে পুরস্কার ভাগ করে দেওয়া হলো না তা জানতে চাওয়া হলেও ওই মুখপাত্র বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শান্তি প্রক্রিয়ার রক্ষকের ভূমিকা পালন করেছেন সান্তোস। সান্তোসের ওই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল দাবি করে নোবেল কমিটির মুখপাত্র বলেন, কলম্বিয়ায় অতীতেও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল। তবে সান্তোস সব উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গভাবে নিতে পেরেছিলেন।

কোনও গেরিলা নেতাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়াটা কঠিন বলেও বিবেচনা করা হয়েছিল কিনা তা জানতে চাওয়া হলে নোবেল কমিটির মুখপাত্র বলেন, ‘যারা পুরস্কার পায়নি তাদের ব্যাপারে আমরা মন্তব্য করি না।’

মহাত্মা গান্ধীকে শান্তিতে নোবেল দেওয়ার বিষয়ে সর্বশেষ নোবেল ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে হয়তো মহাত্মা গান্ধীকে মরণোত্তর এ পুরস্কার প্রদান করা যেতে পারে। তবে তিনি এমন কোনও প্রতিষ্ঠান রেখে যাননি যার পেছনে তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করেছেন। সেক্ষেত্রে তাকে শান্তিতে মরণোত্তর নোবেল দেওয়া হলে পুরস্কারবাবদ তার প্রাপ্ত অর্থ কাকে দেওয়া হবে?

সূত্র: নোবেল ফাউন্ডেশন, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, রয়টার্স।

Save

Please follow and like us:
20

Comments

comments