১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক মীর কাসেম কি ভাবে ?

0
21
১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক মীর কাসেম কি ভাবে ?

১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক মীর কাসেমঃ

১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক মীর কাসেম কি ভাবে ?
১৪ হাজার কোটি টাকার মালিক মীর কাসেম কি ভাবে ?

 জামায়াতের সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগানদাতা মীর কাসেম আলী হলেন মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্পদের মালিক। যার অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা।

একাত্তরে চট্রগ্রাম অঞ্চলের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন হত্যার দায়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে ফাঁসি কার্যকর হয় এই ধনকুবের। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এই আলবদর নেতা। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ফিরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট রাবেতা আল-ইসলাম নামের এনজিওর অর্থে একের পর এক গড়ে তোলেন ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। একপর্যায়ে টাকার কুমির বনে যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জনগণকে বিচ্ছিন্নতাবাদে উদ্বুদ্ধ করে স্বাধীন আরাকান রাজ্য গঠনের কথা বলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে শত, শত কোটি ডলার দেশে এনেছেন মীর কাসেম আলী। রোহিঙ্গাদের জন্য আনা সেই বিপুল অর্থে বিত্তশালী হয়েছেন মীর কাসেম, অর্থ-বিত্তে শক্তিশালী করেছেন জামায়াতকেও। গত তিন দশকে দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী হয়ে উঠেন জামায়াতের এই ধনী ব্যক্তিটি। ব্যাংক, হাসপাতাল, কৃষি, গণমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বিস্তার করেন তার ব্যবসা-বাণিজ্য। মীর কাসেম আলীর বিত্তভৈবব ও সম্পদ নিয়ে এ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে তিনি সর্বোচ্চ সম্পদের মালিক।

এ প্রসঙ্গে ঘাতক দালাল নিমূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘একাত্তর-পরবর্তী সময়ে জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালায় যে- বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় হাজার হাজার মসজিদ, মাদ্রাসা ভেঙে ফেলেছেন মুক্তিযোদ্ধারা। শহীদ করেছেন হাজার হাজার রাজাকার, আলবদর ও আলশামস সদস্যদের। ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ-মাদ্রাসা পুনরায় নির্মাণ ও মৃত রাজাকার-আলবদরদের পরিবার পরিচালনার জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক অর্থ সহযোগিতা পায়। এসব অর্থ লেনদেনের লবিস্ট হিসেবে কাজ করে আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম। তখনই মীর কাসেম হয়ে ওঠেন অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাকিস্তানপন্থীরাই ক্ষমতায় ছিল বেশি সময়। মীর কাসেমও এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরও অর্থ আনার সুযোগ পায়। সেই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে তার পরিমাণ হাজার গুনে বৃদ্ধি করে। সরকারের উচিত একটি কমিশন গঠন করে মীর কাসেম আলীর বৈধ ও অবৈধ সম্পদের হিসাব বের করা৷

যেভাবে উত্থান
দেশ স্বাধীনের পর স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসেন জামায়াতের এই ধনকুবের। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ে পালিয়ে যান লন্ডনে। সেখান থেকে সৌদিআরবে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতি, মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙার বর্ণনা আর পাকিস্তানে আটকে পড়া বাংলাদেশি মুসলমানদের মানবেতর জীবনের কথা বলে এবং তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ জোগাড় করেন তিনি।

পরে ওই অর্থ মসজিদ-মাদ্রাসা পুনর্নির্মাণ কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে ব্যয় না করে নিজেই ভোগ করতে থাকেন পুরো সম্পদ, গড়ে তোলেন এনজিও। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দেশে ফিরে আসেন মীর কাসেম। ১৯৭৬ সাল থেকে শুরু হয় তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সাহায্যপুষ্ট রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের এনজিওর কান্ট্রি ডিরেক্টর হন মীর কাসেম। সেই এনজিওর অর্থে তিনি একের পর এক গড়ে তোলেন ব্যবসায়িক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সেই থেকে জামায়াতের সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগানদাতা মীর কাসেম। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিস্ট নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের নেতৃত্বেও ছিলেন মীর কাসেম আলী। যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিস্ট ফার্মকে আড়াই কোটি ডলার দিয়েছেন। স্থানীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২’শ কোটি টাকা।

২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল তখনকার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, মীর কাসেম আলী মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ প্রশ্নবিদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি লবিস্ট ফার্মকে আড়াই কোটি ডলার দিয়েছেন। লবিস্ট ফার্মটির সঙ্গে ওই চুক্তির কপি এবং টাকা দেওয়ার রসিদ সরকারের কাছে রয়েছে।

রোহিঙ্গা নিয়ে আরএসও প্রতিষ্ঠা
পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থায়নে রাঙামাটির লংগদু ও কক্সবাজারের মরিচ্যা এলাকায় দুটি রাবেতা আল ইসলাম হাসপাতাল গড়ে তোলেন মীর কাসেম আলী। পরবর্তীতে এই দুটি হাসপাতালের পাশে দুটি বড় কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৮০ সালে কক্সবাজারে রাবেতা আল আলম ইসলামী হাসপাতালে জামায়াতের মদদে মীর কাসেমের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদী রোহিঙ্গা তরুণ-যুবকদের নিয়ে আরএসও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করা হয়। নিজেদের কৌশলপত্র নির্ধারণ, মানচিত্র, পতাকা তৈরিসহ নিজস্ব সংবিধানও রয়েছে আরএসও জঙ্গিদের।

সূত্রমতে, মীর কাসেম আলীর তত্ত্বাবধানে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার পাহাড় ও সমুদ্র চরাঞ্চল এলাকায় আরএসও গড়ে তুলে ১০টি মাদ্রাসা-এতিমখানা ও রোহিঙ্গা বস্তি। এসব স্থাপনা তৈরি করতে আরএসও ক্যাডাররা অবৈধ দখলে নেয় অন্তত দু’শ একর বন বিভাগের জমি। এর নেপথ্য অর্থ যোগানদাতা মীর কাসেম আলীর রাবেতা এনজিও।

যে পরিমাণ সম্পদের মালিক
জানা গেছে, মীর কাসেম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজারের বেশি শেয়ার। ঢাকার মিরপুরে রয়েছে তার একটি বহুতল ভবন। এই মানবতাবিরোধী অপরাধীর তত্ত্বাবধানে থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ২০৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এসব ব্যবসা থেকে বিপুল আয়ের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করতেন জামায়াতের রাজনীতির পেছনে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ সম্পদই বিভিন্ন কোম্পানি, ট্রাস্ট ও বেসরকারি সংস্থার নামে রয়েছে। বৈধভাবে আয়কর রিটার্নে তার সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলীর করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ০৭৬-১০৩-৯৬৬৩। তিনি ঢাকা কর অঞ্চল-৫-এর সার্কেল ৫০-এর করদাতা। ঢাকার মিরপুরের দক্ষিণ মনিপুরে ২৮৭ নম্বর প্লটের বহুতল ভবন তার নামে। মোহাম্মদপুরে একতা সোসাইটির ৫ কাঠা জমি ও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে সাড়ে ১২ শতক জমি রয়েছে। তিনি ধানমণ্ডির বহুতল ভবন কেয়ারী প্লাজার ১৭৮ দশমিক ৬৯ বর্গমিটারের মালিক।

নিজের ও তার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা ৩০ হাজার শেয়ার এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ১১৩টি , কেয়ারী লিমিটেডের ১৪ হাজার, কেয়ারী টেলিকমের ১০ হাজার, কেয়ারী ট্যুরস অ্যান্ড সার্ভিসেসের ১ হাজার, কেয়ারী ঝর্নার ২০টি, কেয়ারী তাজের ৫, কেয়ারী সানের ৫, কেয়ারী স্প্রিংয়ের ২০, সেভেল স্কাইয়ের ১০০, মীর আলী লিমিটেডের ২৫ এবং দিগন্ত মাল্টিমিডিয়া লিমিটেডের ১০০টি শেয়ার রয়েছে মীর কাসেম আলীর নামে। তিনি কেয়ারী লিমিটেডের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য (প্রশাসন), ইবনে সিনা হাসপাতালের পরিচালক, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রি পরিচালক, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্টের সদস্য ও ফুয়াদ আল খতিব চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের সদস্য।

এছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে আছেন মীর কাসেম আলী। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেসমেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন, আল্লামা ইকবাল সংসদ, ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম, দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটি, সেন্টার ফর স্ট্রাটেজি অ্যান্ড পিস, বায়তুশ শরফ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ইসলামিক ট্রাস্ট ও ইসলামিক ইকোনমিক্স রিসার্চ সেন্টার। এছাড়া তিনি জড়িত রয়েছেন ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন, রাবেতা আল আলম আল ইসলামী এবং অ্যাসোসিয়েশন অব মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার এজেন্সির সঙ্গেও।

সর্বশেষ ২০১০ সালে মীর কাসেম আলী তার আয়কর রিটার্নে ব্যক্তিগত সম্পদ দেখিয়েছেন ৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে তার নামে থাকা শেয়ারগুলোর মূল্য ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ঢাকার বাড়ি ও জমির দাম মাত্র কয়েক লাখ টাকা করে উল্লেখ করা হয়েছে রিটার্নে। সে সময় তার বার্ষিক আয় ছিল ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে ছিল ১৮ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে তার তত্ত্বাবধানে থাকা কেয়ারী লিমিটেডের নামে ব্যাংক ঋণ ৬০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, ইবনে সিনা ট্রাস্টের নামে ৫০ কোটি, ইবনে সিনা হাসপাতালের ৬ কোটি ৩৪ লাখ, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের ২০ কোটি, দিগন্ত মিডিয়া কর্পোরেশনের নামে ৪১ কোটি ৩৫ লাখ, এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়ালের ২৩ কোটি ৭৫ লাখ এবং ফুয়াদ আল খতিবের নামে ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে।—-

আলমগীর হোসেন

Please follow and like us:
20

Comments

comments