যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন…

0
13
যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন...

যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন...

দুজনের মধ্যে অদ্ভুত মিল। বিয়ে, বিয়ে-পরবর্তী জীবন আর সবশেষ মৃত্যুটাও যেন এক সুতোয় বাঁধে তাঁদের। কথা হচ্ছে হলিউড অভিনেত্রী প্রিন্সেস অব মোনাকো গ্রেস ক্যালি ও প্রিন্সেস ডায়ানাকে নিয়ে। তাঁরা দুজন ইউরোপের দুটো বড় রাজপরিবারের পুত্রবধূ ছিলেন। দুজনই সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে রূপকথার মতো রাজকন্যার জীবনে প্রবেশ করেন। তবে তাঁদের রূপকথার শেষটা কিন্তু ‘সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন’ দিয়ে হয়নি। দুজনই মারা যান মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায়। ১৯৮২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনায় নিহত হন গ্রেস। আর ডায়ানার মৃত্যু হয় ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট।

যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন...
যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন…

১৯৮১ সালের ৩ মার্চ। রাজপুত্র চার্লসের সঙ্গে বাগদানের ঠিক সাত দিন পর ডায়ানা সেদিন প্রথম হবু রাজবধূ হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে আসেন। আর সেদিনই রাজকীয় জীবনের চাকচিক্য দেখে ভিরমি খেয়ে যান ডায়ানা স্পেনসার নামের ১৯ বছরের সাধারণ (তখনো) মেয়েটি। সেই বিষম খাওয়া ডায়ানাকে সেদিনই বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন প্রিন্সেস অব মোনাকো গ্রেস কেলি। সে-ই তাঁদের প্রথম দেখা। সেদিন নাকি তাঁকে ঘিরে সবার প্রবল আগ্রহ দেখে ডায়ানা দারুণ ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নতুন জীবনকে সামাল দেওয়ার চিন্তায় উন্মুক্ত কাঁধের কালো গাউনটা পর্যন্ত সামলাতে পারছিলেন না তিনি। ডায়ানার এই অস্থিরতা গ্রেস ক্যালির চোখে পড়ে। ডায়ানাকে ডেকে তিনি নিয়ে যান লেডিস রুমে। সেখানে কিছু অন্তরঙ্গ সময় কাটান এই দুই রাজকন্যা। লেডিস রুমে গিয়ে আয়নায় নিজের সাজগোজ দেখতে দেখতেই ডায়ানা নাকি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। তাঁর ভয়, উদ্বেগ আর সবার কৌতূহলী দৃষ্টি ছিল ডায়ানার কান্নায় ভেঙে পড়ার কারণ। চোখে পানি নিয়েই গ্রেসকে ডায়ানা বলেছিলেন, কাঁধ খোলা গাউনটি পরে দারুণ ইতস্তত লাগছিল তাঁর। মাপের চেয়ে দুই সাইজ ছোট গাউনটা। তার ওপর ক্যামেরার ফ্ল্যাশগুলো যখন তাঁকে দেখে বারবার জ্বলে উঠছিল, তখন নাকি সেই অস্বস্তি ডায়ানাকে আরও চেপে ধরে। সবার উৎসুক চোখ প্রথম দিনই রীতিমতো আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয় ডায়ানার। ঘাবড়ে যাওয়া মেয়েটির কান্না জড়ানো কথা নাকি সে সময় গ্রেস ক্যালিকে তাঁর অতীত মনে করিয়ে দেয়।
পঞ্চাশের দশকে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী গ্রেস ক্যালি যখন প্রথম খ্যাতির স্বাদ পান, তখন তাঁর সঙ্গে এমনটা হয়েছিল। সবার অতি উৎসুক চোখ ক্যালিকেও একসময় ঘাবড়ে দিত। তাই আশির দশকে এসে ডায়ানার ভেতর যখন নিজের সেই ছায়াটি দেখলেন গ্রেস, তখন হবু ব্রিটিশ রাজবধূর পাশে দাঁড়ালেন তিনি। ডায়ানার পিঠ চাপড়ে তাঁকে সাহস জোগালেন। আদর করে ভবিষ্যতের ব্যাপারে অবগতও করে দিলেন। বললেন, ‘চিন্তা কোরো না। তুমি দেখো, একসময় সব সামলে নিতে পারবে। এর চেয়েও কঠিন সময় আসবে সামনে। তখনো পারবে।’
১৯৮২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। গ্রেস-ডায়ানার প্রথম সাক্ষাতের ১৮ মাস পর, ডায়ানা আবারও সেই কালো রঙেরই একটা গাউন পরা। এবারও কাঁদছেন তিনি। এবারও তাঁর সামনে গ্রেস, তবে নিথর দেহে। সেদিন ছিল প্রিন্সেস অব মোনাকো গ্রেস ক্যালির শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান। প্রথম সাক্ষাতের দিন আলফ্রেড হিচককের নায়িকা যে উপদেশটি দিয়েছিলেন প্রিন্সেস অব ওয়েলেসকে, এরই মধ্যে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন ডায়ানা। কিন্তু শেষ নাগাদ তিনিও পারেননি জীবনের চূড়ান্ত ‘ট্র্যাজেডি’ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে। তাই একই রকম সড়ক দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে ১৫ বছর পর ডায়ানাও চলে যান পৃথিবী ছেড়ে। দুই রাজকন্যার গল্পটা রূপকথার মতো শেষ হয়নি। তবে দুজনই একই বিষাদে ভরা উপসংহারের কারণে গেঁথে আছেন একই সুতোয়।

.যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন...
যে রাজকন্যারা রূপকথার মতো নন…

গ্রেস ক্যালি
১৯৮২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৫২ বছর বয়সী প্রিন্সেস গ্রেস ক্যালি তাঁর ছোট মেয়ে স্টেফানিকে নিয়ে তাঁদের ফ্রান্স-মোনাকো সীমান্তবর্তী অবকাশযাপনের বাংলো থেকে ফিরছিলেন। অনেক মালপত্র ছিল তাঁদের সঙ্গে। পুরো গাড়ি বোঝাই হয়ে যাওয়ায় গাড়িচালককে রেখে গ্রেস নিজেই বসে পড়েন চালকের আসনে। মাত্র ৩৫ মিনিটের পথ। সহজেই বাড়ি পৌঁছে যাবেন এই ভেবে মেয়েকে পাশের সিটে বসিয়ে রওনা দেন বাড়ির দিকে। কিন্তু রওনা হওয়ার ১০ মিনিটের মাথায় ‘ডেভিল’স কার্স’ নামের একটি দুর্ঘটনাপ্রবণ রাস্তায় ইউ-টার্ন করাতে গিয়ে খাদে পড়ে যায় অস্কারজয়ী এ অভিনেত্রীর গাড়ি। মেয়ে স্টেফানি বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হন গ্রেস। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মোনাকো হাসপাতালে। অস্ত্রোপচারের পরও জ্ঞান ফেরে না গ্রেসের। তাঁকে রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে। তবে লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাঁকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে তিনি মারা যান।

প্রিন্সেস ডায়ানা
ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর রহস্য আজও ভাবায় বিশ্বকে। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ঘটে দুর্ঘটনাটি। ফ্রান্সের প্যারিসে একটি টানেলে তাঁর গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। গাড়িতে ডায়ানার সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রেমিক মিসরের ধনকুবের দোদি ফায়াদ, দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোনস ও গাড়িচালক হেনরি পল। দুর্ঘটনায় ডায়ানা, দোদি ও হেনরির মৃত্যু হয়। বেঁচে যান শুধু দেহরক্ষী ট্রেভর রিস-জোনস। ৩৬ বছর বয়সী ডায়ানার মৃত্যুর এ ঘটনাকে ভিত্তি করে ২০০৭ সালে তৈরি হয় দ্য মার্ডার অব প্রিন্সেস ডায়ানা নামের হলিউড ছবি। এ ছবিতে ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথের চরিত্রে অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার ও বাফটা পুরস্কার জিতেছিলেন হেলেন মিরান।

গার্ডিয়ান ও ডেইলি মেইল অবলম্বনে

Please follow and like us:
20

Comments

comments