ফেসবুকে অন্যকে হেয় করে কষ্ট দেওয়া

0
83
ফেসবুকে অন্যকে হেয় করে কষ্ট দেওয়া

ফেসবুকে অন্যকে হেয় করে কষ্ট দেওয়া

ফেসবুকে অন্যকে হেয় করে কষ্ট দেওয়া
ফেসবুকে অন্যকে হেয় করে কষ্ট দেওয়া

এই তো কিছুদিন আগে ফেসবুকের একটা স্ট্যাটাসে চোখ আটকে গেল। স্ট্যাটাসের কথাগুলো এমন—তিনি দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন, কাটাচ্ছেন নয়টা-পাঁচটার ছকে বাঁধা কর্মজীবন। তাঁর এক প্রিয় বন্ধু একটি কলেজ থেকে চারবারের মাথায় স্নাতক পাস করেছেন। সেই বন্ধু অসাধারণ ছবি আঁকেন, গ্রাফিকসের কাজ করেন। অনেক বেশি খ্যাতিমান তিনি। যিনি স্ট্যাটাস দিয়েছেন তাঁকে কেউ চেনে না। কিন্তু ওই বন্ধুকে অনেকেই চেনে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ফলাফল যে বড় বা বিখ্যাত হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখে না, এই সিদ্ধান্তে এসে তিনি স্ট্যাটাস শেষ করেছেন। সাম্প্রতিক কিছু বিষয়ের উদাহরণও টেনেছেন। স্ট্যাটাসে তিনি সত্যি কথাই হয়তো লিখেছেন, কিন্তু তাঁর বন্ধুকে কিছুটা হেয়ই করেছেন। কিছুটা তাচ্ছিল্যের ছোঁয়া রয়েছে। ওই বন্ধু স্ট্যাটাসের বক্তব্যের সঙ্গে একমত, কিন্তু একটা মনোবেদনা তৈরি হয়েছে তাঁর মধ্যে।
অফিসে যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে মনে করছেন একজন কর্মী। একদিন চাকরিটা ছেড়েই দিলেন। আর সেদিনই ফেসবুকে দিলেন এক স্ট্যাটাস। সেখানে সদ্য ছেড়ে আসা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক কথাই শুধু নয়, রীতিমতো গালিগালাজ। প্রতিষ্ঠান মানে তো আর শুধু জড়বস্তু নয়, কর্মীদের সমন্বয়েই প্রতিষ্ঠান। তাই বস, সহকর্মীরাও তাঁর গালির হাত থেকে রেহাই পেলেন না। আর সামাজিকমাধ্যম বলে কথা, কমেন্ট-পাল্টা কমেন্টে মুহূর্তেই ভরে উঠল ওই কর্মীর প্রোফাইলের ওয়াল। যাঁদের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলা হয়েছে, তাঁদের না চিনেই উল্টাপাল্টা মন্তব্য করতে থাকলেন কর্মীর ফেসবুক ফ্রেন্ডদের কেউ কেউ। যাঁদের সম্পর্কে বিরূপ কথা বলা হয়েছে, তাঁরা বিব্রত, বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন।
এই সময়ে এসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক উপেক্ষা করা যায় না। ভার্চ্যুয়াল জগৎ বলে একে ফেলে দেওয়াও যায় না। জায়গাটা ভার্চ্যুয়াল হলেও এর ব্যবহারকারীরা তো রিয়াল, বাস্তব দুনিয়ার মানুষ। তাঁদের লেখা, মন্তব্য, ছবি কিংবা ভিডিও সবই তো বাস্তবের। ফলে কাউকে আঘাত দিয়ে কিছু লিখলে বা আপত্তিকর ছবি দিলে সে মর্মাহত হবে, এটা বলা যায় সহজেই।
‘অন্যকে হেয় সেই করে যার মধ্যে হীনম্মন্যতা থাকে।’ এমনটাই মন্তব্য করলেন মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল। তিনি যোগ করলেন, ‘অন্যকে খোঁচা মেরে বা আঘাত দিয়ে কেউ কেউ মনে করে যে সে বাহাদুরি নিচ্ছে। আসলে তা নয়। সে হীনম্মন্যতায় ভুগছে, সেটারই প্রকাশ ঘটছে তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে।’ মোহিত কামাল বলেন, ‘মানুষের আচরণের মধ্যে স্যাডিস্টিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটা কারও মধ্যে প্রকট। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুৎসা রটিয়ে কিংবা আঘাত করে কথা বলা হয়। একটা বিষয় অনেকে বুঝতে চায় না, আমি কাউকে ছোট করলে অন্যরা তাকে নয়, আমাকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে।’
একটা উদাহরণও দিলেন মোহিত কামাল। মৌখিক পরীক্ষা দিতে এসেছে এক ছাত্র। ভাইভা বোর্ডে থাকা একজন শিক্ষক তাকে বলেছেন, অমুক জায়গার ছেলে হয়েও তোমার উচ্চতা তো ভালোই। পরীক্ষার পর ছাত্রটি তার ফেসবুকে এ ঘটনা লিখে জানাল, এমন প্রশ্নই তাকে করা হয়েছে, ‘ভাইভা’ তার ভালো হয়েছে। সঙ্গে উল্লাস চিহ্ন। মোহিত কামাল বললেন, অনেক সময় পরীক্ষার্থীকে সহজ করতে শিক্ষকেরা এমন বলে থাকেন। সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করলে শিক্ষকদের সম্পর্কে অন্যদের মনে কী ধারণা তৈরি হয়! ‘এমন করা ঠিক নয়।’
সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরীন মনে করেন, ‘কাউকে আঘাত করে ফেসবুকে কিছু প্রকাশ করলে সেটা একজনের কাছে থাকে না। এটা মুক্ত। সে কারণে ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটির জায়গাগুলোতে এসব মানসিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যা সামনাসামনি করি, সে রকম থাকে না বিষয়গুলো। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ব্যাপারে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, এখানে সম্পাদনা করার কেউ নেই। আইনগতভাবে একে আটকানোও যাবে না।’ মাহবুবা নাসরীন বলেন, ‘এই কারণে নৈতিকতার ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে সব সময়। ফেসবুক স্ট্যাটাস, কমেন্ট বা ছবিতে অনৈতিক কিছু করা যাবে না। নৈতিকতা মেনে চললে সবার জন্যই ভালো এটা।’
বন্ধুরা একে অন্যকে খোঁচায়। কম বয়সীদের মধ্যে এই প্রবণতা বড্ড বেশি। এই খোঁচাখুঁচির মধ্যে আছে এক ধরনের আনন্দ। আর তা ফেসবুক অবধিও গড়ায়। বন্ধুদের মধ্যে এ জন্য ‘পচানি’ শব্দটাও চালু আছে। কুমিল্লার সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী আছিয়া আক্তার বলে, ‘নির্ভর করে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে পচাতেই পারে। কিন্তু সেটা ওই পর্যন্তই। প্রকাশ্যে হেয় করা যাবে না। আর ফেসবুকে তো এসব মানাই যায় না।’
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ফেসবুকে নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়, ব্যক্তিগত আক্রমণও চলে। ফলে যিনি আক্রান্ত হন, তিনি কষ্ট তো পানই, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিকভাবে ভেঙেও পড়েন। ‘এসব একেবারে উপেক্ষা করতে হবে। জাস্ট ইগনোর’, বললেন সামাজিক উদ্যোগ আমরাই বাংলাদেশের সহপ্রতিষ্ঠাতা আরিফ আর হোসেন, যিনি ফেসবুকে বেশ সক্রিয় এবং জনপ্রিয়।
আরিফ আর হোসেনের পর্যবেক্ষণ হলো, ফেসবুকে বিতর্ক হতে পারে। এটা ভালো। তবে অন্যের চরিত্র হনন করা হয় ভুয়া (ফেক) অ্যাকাউন্ট থেকে। ‘যখন নিজেকে আড়াল করে কেউ অন্যকে গালি দিচ্ছে বা আক্রমণ করছে, তখন তাকে গোনায় না ধরাই ভালো।’ বললেন, আরিফ আর হোসেন। বাস্তব অ্যাকাউন্ট থেকেও কখনো কখনো খোঁচা দেওয়া হয়। নিজের মনমতো না হলেই গালি দিতে হবে, এটা ঠিক নয় বলেই মনে করেন আরিফ আর হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ক্ষেত্রে যখনই সমালোচনা দেখি, ধরে নিই এগোতে গেলে অনেক পাথর আসবে পথে। এখন সেগুলো যদি সরাতে বসি তবে এগোবো কীভাবে? সমালোচনা যে করবে তার মাথায় রাখা উচিত, সমালোচনা হতে হবে পরিমিত বৃষ্টির মতো, যা গাছকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করবে।’

Please follow and like us:
20

Comments

comments