জাপানিদের সাথে জীবন থেকে নেয়া একটি গল্প

0
712
জাপানিদের সাথে জীবন থেকে নেয়া একটি গল্প

জাপানিদের সাথে জীবন থেকে নেয়া একটি গল্পঃ

জাপানিদের সাথে জীবন থেকে নেয়া একটি গল্প
জাপানিদের সাথে জীবন থেকে নেয়া একটি গল্প

যদি কেউ তোমাকে বিনা দোষে এক গালে চড় দেয় তো আরেক গাল বাড়িয়ে দিও। তখুনি বিনা দোষে তোমাকে চড় দেবার অনুশোচনা তার হবে। এতেই সে তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়ে যাবে।”  একজন মনীষীর  উক্তি হিসেবে শুনেছিলাম। কিন্তু যেদিন শুনেছিলাম সেদিন কথাটা খুব অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। কারণ, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন।

কথাটার তাৎপর্য কয়েক যুগ পর আজ ৯ জুলাই কড়ায় গন্ডায় বুঝে গেলাম।  আমরা থাকি জাপানের একটা ছোট শহরে। ৯ জুলাই আমার ছোট ছেলের জুনিয়র হাই স্কুলের বাস্কেটবল ক্লাবের কোচের জন্মদিনের পার্টি। জাপানিজ মায়েরা প্রায় সবাই গৃহিনী। বিয়ের পর সংসার, সন্তান ঘিরেই তাদের জীবন।

বাস্কেটবল ক্লাবের সাপ্তাহিক যে কোনো টুর্নামেন্টে  নিয়মিত তারা যান। বিবিধ দায়িত্ব পালন করেন,  আবার গ্রুপ মেসেজে হালনাগাদও জানিয়ে দেন। তাদের প্রতি বার বার কৃতজ্ঞতা প্রকাশটুকুই আমার সামর্থ্য। আমার দশা তাদের চেয়ে একেবারে ভিন্নতর। ত্রাহি ত্রাহি প্রবাস জীবনে অফিস, সংসার সামলে বিবিধ সামাজিক- সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডে আমার রোজ মধ্যরাত অবধি নাভিশ্বাস। তবুও সেদিনের আয়োজনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে গিয়েছিলাম। আপাদমস্তক সঙ্গী ছিল চোরা অস্বস্তি।

নিয়মিত অনুপস্থিতির অস্বস্তি না,  ১ জুলাই গুলশানের বর্বোরোচিত হত্যাকাণ্ডে দীর্ঘস্থায়ীভাবে খোদাইকৃত অস্বস্তি। সবচেয়ে পরীক্ষিত, দীর্ঘদিনের বন্ধু , স্বভাববিনয়ী জাপান, যাদের সভ্যতা-ভব্যতার শিষ্টাচার  আমাদের অনুদান, ঋণ প্রকল্পে তাদের সর্ববৃহৎ দাতার মর্যাদা দিয়েছে, সেটাও কিনা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো রকম অনধিকার চর্চা, প্রশ্নব্যয় ছাড়াই, আমরা তাদের পিঠেই গাদ্দারির ছোঁরা বসিয়ে দিয়েছি।

এতো বড় কৃতঘ্নতার, অকৃতজ্ঞতার দায়ে তারা যদি তাদের  ভূখণ্ডে আমাদের খোলা রাস্তায় জুতা পেটাও করে , গাদ্দার বলে চাবুক পেটা করে সেই প্রতিক্রিয়াও যেন আজ মাথা পেতে মেনে নিতে হবে। অবশ্যই আমি জন্মসূত্রের দায়, রক্ত সূত্রের দায়ে দাগী। গরীব লোকের ট্যাক্সের পয়সায় পড়ে আজ আমি প্রবাসে নিশ্চিত জীবনে থেকে “দেশের কিচ্ছু হবে না” বলতে পারি না । কারণ, আমিও কিছুই করি নাই দেশের “কিছু হবার”  জন্য। নিজের উন্নত, নিরাপদ জীবন কেবল নিশ্চিত করেছি।

তিন ঘ্ন্টার বেশি সময় ধরে সেদিনের পার্টি চললো। অনেকদিন পর পর যাই বলে সব মায়েরা এসে খোঁজ নেন, যথারীতি আমার অপরিপক্ক জাপানিজেই সব হালনাগাদ বিস্তারিত আদান প্রদান করলাম। রমজান, ঈদ, ঈদের পোশাক, ছবি দেখা কোনো কিছুই বাদ থাকেনি। শুধু বাদ ছিল “হলি আর্টিজান হত্যাকাণ্ড”।

সব কয়টা আয়োজনে আমাকে তারা একমাত্র বিদেশি এবং বয়োঃকনিষ্ঠ মা বলে সবচেয়ে বেশি আদর যত্ন করে একপ্রকার জোর করে করে অংশগ্রহণ করালো। আর আমার অপরাধী মুখ অদৃশ্য চড়ের উপর্যুপরি আঘাতে নিচু হতে হতে যেন গোড়ালিতে গিয়ে ঠেকলো। অথচ আমার ছোট ছেলের নাম নিবরাস বলে তার বন্ধুরা গ্রুপ মেসেজে নিহত জঙ্গি নিবরাস ইসলামের টুইট শেয়ার করে ওর সাথে মজাও করেছে ঘটনার পর পর।

অন্যদিকে আমাকে সান্ত্বনা জানিয়ে আমার সহকর্মীরা শুধু নয়, ছেলের এক জুনিয়রের মা পর্যন্ত দেশে আমার আত্মীয়দের খোঁজ নিয়েছেন। আরেক বাংলাদেশির কাছে খবর পেলাম একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়ে গেছেন কোনো জাপানির আমাদের কারো প্রতি নেতিবাচক আচরণ দেখলে সাথে সাথে স্থানীয় পুলিশকে খবর দিতে। হায়রে মহানুভবতা! পরম নিরাপদেই থাকি আলহামদুলিল্লাহ, তার উপর আবার নিরাপত্তা জোরদার!!

সেদিনের সেই বাণীটি অনুধাবন করবার মতো মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নটুকু যে হয়েছে, এই বোধটাই ছিল একমাত্র স্বস্তি।  সত্যি যেদিন এই কলল্কজনক রাতের পর প্রথম অফিস গেলাম সারারাস্তায় কাঁটা হয়ে ছিলাম, অফিসে সারাদিন যেন চোর হয়ে ছিলাম। হুড়মুড় করে সাবওয়ে ট্রেন ধরে কপালে ঘাম মুছতে রুমালের খোঁজে ব্যাগের ভেতর দ্রুত হাত চালাতে চালাতে হঠাৎ তৃতীয় চক্ষুর সতর্কতায় সহযাত্রীদের দিকে চোখ গেল। থমকে গেলাম।

মনে হলো যেন সবার আতংকিত দৃষ্টি আমার ব্যাগবন্দী হাতের দিকে। নিজের অপরাধী মনের কারণেই সাধারণ দৃষ্টিই কি আমার কাছে খুব অন্যরকম মনে হয়েছিল? তৎক্ষণাৎ হাত মাথার উপর তোলার মতন ব্যাগের ভেতর থেকে হাত সরিয়ে এনেছিলাম।

সারাদিনই বাসে, পথে ঘাটে এই অস্বস্তি এখন নিত্যসঙ্গী। অফিসে বাংলাদেশের সাথে এক সাবসিডাইসড ব্যবসায়িক প্রকল্প নিয়ে খুব ব্যতিব্যস্ত ছিলাম সবাই  ১ জুলাইয়ের সকাল পর্যন্ত। নাভিশ্বাস ছিলাম আমি, উত্তেজিতও বটে। দেশের যে কোনো প্রজেক্ট নিয়েই স্বভাবতই তাই থাকি, ম্বার্থপরের মতন হলেও।

কিন্তু ১ জুলাই এর পর থেকে কারো এ বিষয়ে টু- শব্দ নেই। শুধু আমার ঘনিষ্ঠ কলিগ বললো, এই মুহূর্তে জাপান সরকারের বার্তা যাই থাক, জনমনে এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে সময় নেবে। প্রাথমিক এই শক কাটবার পরেও মনে হয় না এই প্রজেক্ট নিয়ে টীম শিগ্রিই তোমার দেশে যেতে চাইবে। এদের কাউকে জোর করলে প্রয়োজনে এই দুর্মূল্যের বাজারেও চাকরি ছেড়ে দেবে। আগেতো প্রাণ বাঁচুক!

সরকার জনগণের ট্যাক্সে চলে, এই বর্বোরোচিত ঘটনার পর জাইকার চলমান প্রকল্প না থামুক, পরবর্তী কাজের জন্য জনমনের এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতকে তার সন্মান জানাতেই হবে। জাপানের সংবাদমাধ্যমেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে, বিশেষ করে মুসলমানপ্রধান তৃতীয় বিশ্বে জাপানের ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

কোনোরকম ওয়ারেন্ট ছাড়াই অপেন নজরদারি গৃহীত হয়েছে ।  উল্লেখ্য, নিহত সাত জাপানির সবাই বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজে জড়িত ছিলেন। মহৎপ্রাণ সেই মানুষগুলির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়নের কাজে তাঁরা জড়িত ছিলেন বলে তাঁদের মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে বেদনাহত করছে…যে নির্দয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেসব জীবন হরণ করা হয়, তাতে আমি গভীরভাবে ক্ষুব্ধ।’

হতাশ,হতোদ্যম হয়ে আমি একদিন প্রায় অকার্যকরই কাটালাম। কিন্তু জীবন কি থেমে থাকে? বসে থাকলে তো নিজের চাকরী নিয়েও টান পড়বে। প্রবাস জীবনে পায়ের তলার মাটি সবসময়েই বড় নড়বড়ে। বাস্তব বড় কঠিন, লাশ ফেলে রেখে মানুষকে পেটের দায়ে বের হতে হয়,শোকের সময় কই? জীবিতদের তো বাঁচতে হবে। আপাতত দেশের ফাইলগুলি সরিয়ে অন্য দেশের ফাইল খুলে বসলাম। দুঃখজনক দিকটি হচ্ছে হামলাকারীরাও কিন্তু এই একই ফলাফলই দেখতে চেয়েছিল। ফলে তাদের সেই পরোক্ষ উদ্দেশ্য একদিক থেকে বাস্তবায়িত হতে চলেছে।

জাপানিদের মধ্যে যারা খুব কাছ থেকে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের চিনেছেন,  ভালোবাসেন, তাঁদের অনেকে এখন শঙ্কিত যে এই ঘটনায় দুই দেশের মধ্যেকার উষ্ণ সম্পর্ককে কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্থ, প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। তাদের ধারণা, নিহত সাত জাপানি কোনো নীলনকশার অংশ না হয়ে যদি স্রেফ ঘটনাচক্রেও সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্য হয়ে থাকে তবুও বাংলাদেশ নিয়ে জাপানিদের মনে জেগে ওঠা সংশয়, আতঙ্ক সহজে দূর হওয়ার নয়। জাপানে অনেকেই এখন বাংলাদেশকে অনেকটা বিপজ্জনক মুসলিম দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত হিসেবে দেখতে শুরু করবে এবং অপরিহার্য নাহলে সেই দেশে যাওয়া কিংবা দেশটির সংস্পর্শ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। অফিসিয়ালিই তাই বলা হচ্ছে সবখানে।

সারা রোজার মাস অফিসে এরা পরম শ্রদ্ধা ও ততোধিক বিস্ময় নিয়ে আমাকে দেখতো। অথচ, রোজার শেষে ঈদের দিন আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসবের কথা জানিয়ে ছুটি নিতে পারিনি। ব্যাক্তিগত কারণ বলে ছুটির আবেদন বাড়ি ফিরে ইমেইলে করেছি। নিজের অপরাধী মন বলেছে ওরা মনে মনে যেন ভাববে , “ আহারে সংযম!!! অদৃশ্য স্রষ্টার সন্মানে, নির্দেশে খেতে বারণ, আর খুন করা জায়েজ এবং তাও সেই একই মাসে? ভণ্ডামির ঠিক কোন পর্যায়ে তোমরা অবস্থান করো?”

প্রাতিষ্ঠানিক ভাবেই প্রাইমারি স্কুল থেকে এদের শেখানো হয় মনের ৩০% কেবল প্রকাশ করবে। সেই প্রকাশিত ৩০% ভাগেও আমি কোনো ঘৃণা দেখিনি। পথে ঘাটে, রাস্তায় আত্মনিয়ন্ত্রণের বয়স পেরিয়ে যাওয়া বৃদ্ধ মানুষগুলির অবাক চাহনি কি আগের মতই ছিল?  নাকি এখন একটু বিতৃষ্ণা মিশে গেছে? কি জানি!

আমার জন্মভূমির, আমার ধর্মের নামধারীদের কৃতকর্মের দায় আমাকে তো সইতেই হবে অন্তত যতদিন না সেই দায় মোচনের কোনো পদক্ষেপ হয়, ব্লেম গেম আর ঘরপোড়ায় আলু পোড়া দেবার নষ্ট মানসিকতা থেকে বেরিয়ে সমস্যার উত্তরণে দেশ সমষ্টিগত হয়।

তবুও এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজি, অবস্থানগত কারণে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি এমন ভূখণ্ডেও আছেন যা আরও উত্তপ্ত এই একই  অনলে। কষ্ট সেটাই যে, ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার ধর্মকে নষ্ট করতে ইসলামের মিথ্যা মুখোশধারী ধর্মীয় মাফিয়াদের ভুল আফিমে যুক্তি-বুদ্ধি লোপপ্রাপ্ত বিপথগামীদের আক্রমণে আমার মাতৃভূমি-আবাসভূমি দুই-ই ক্ষত বিক্ষত।

সাতটি নিরীহ প্রাণ অতিথিপরায়ণ দেশটির উন্নয়নেই গিয়েছিল। বিনিময়ে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে নিথর দেহে ফিরে এলো। অথচ, আমার আর কোথাও যাবার নেই!  কিচ্ছু করার নেই !!!

লেখক : কলামিস্ট; প্রাক্তন রিসার্চ ফেলো, কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়; বিভাগীয় প্রধান, বিজনেস প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট, স্মার্ট সার্ভিস টেকনোলজিস কো. লিমিটেড, ফুকুওকা, জাপান

Please follow and like us:
20

Comments

comments