একজন ভালো ডাক্তার হবার উপায়- হয়ে উঠুন বেষ্ট ডক্টর!

0
388
ভালো ডাক্তার হবার উপায়

যে কোনও পেশায় সাফল্য–ব্যর্থতা হাতে হাত ধরে চলে। কিন্তু ‘‌চিকিৎসক’‌ হওয়ার পেশাটিতে মানুষের সঙ্গে থেকে তাঁদের ভাল–মন্দ, আনন্দ–দুঃখের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যাওয়া, তাঁদের কাছে এই মাত্রায় শ্রদ্ধা ও সম্মান পাওয়া কিন্তু অন্য খুব কম পেশাতেই মেলে।
কোনও আদর্শ চিকিৎসকই এক-‌দুই দিনে তৈরি হয় না, একটু একটু করে একজন ছাত্র বা ছাত্রী চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। পিছনে পড়ে থাকে অক্লান্ত পরিশ্রম, ‌অধ্যবসায়, একাগ্রতা আর পেশার প্রতি প্যাশন। অবশ্য পড়ে থাকে বলা ভুল। চিকিৎসার পেশায় এর কোনওটারই শেষ হওয়া চলে না, একটারও উপস্থিতির অভাব থাকলে যথাযথ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে বজায় রাখা অসম্ভব।
তবে চিকিৎসকের যথার্থতার উপাদান এখানেই শেষ না। আনাচ–কানাচে জড়িয়ে থাকে এমন কিছু দিক, যা অজান্তেই কোনও একজন চিকিৎসককে সমসাময়িকদের থেকে তাঁকে রোগীর কাছে একটু আলাদাভাবে তুলে ধরে। প্রথম থেকেই শিক্ষকদের পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ করলে, তাঁদের শিক্ষাকে মাথায় রেখে পেশা শুরু করলে, তবেই নিজে এগুলো আয়ত্ত করা সম্ভব।
‌ডাক্তার যখন রোগী দেখতে আসেন, প্রথমবার দেখাতেই সেই রোগীর মধ্যে একটা ধারণা তাঁর ডাক্তারবাবু সম্পর্কে তৈরি হয়ে যায়, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ‘‌ফার্স্ট ইমপ্রেশন’‌। এই প্রথমবারের ইমপ্রেশনটা ভাল হওয়ার ওপর রোগী ও চিকিৎসকের পারস্পরিক সম্পর্কটা নির্ভর করে। এটা যদি ভাল না হয়, যথাযথ কমিউনিকেশন বা সংযোগের অভাবে রোগের চিকিৎসা বা রোগীর সেরে ওঠাও সহজ হয় না। দুটি জিনিস এ ক্ষেত্রে মাথায় রাখা জরুরি—
✦ একজন‌ চিকিৎসকের সব সময় নিজের পোশাকের ওপর নজর রাখতে হবে। হয়ত এটা পড়ে কেউ অবাক হচ্ছেন বা নাক কুঁচকাচ্ছেন। হয়ত ভাবছেন চিকিৎসকের জামাকাপড় নিয়ে ব্যস্ত থাকাটা বিলাসিতা। আসলে একেবারেই তা নয়। একটু বুঝিয়ে বলা যাক। পোশাকে নজর দেওয়া মানেই কিন্তু দারুণ দামি, ঝাঁ–চকচকে জামার কথা বলা হচ্ছে না। একজন চিকিৎসকের পোশাক এমন হবে না, যার সঙ্গে ডাক্তারের নিজস্ব ইমেজটাই বেমানান হয়ে যায়। তা হলে উপায়?‌ প্রথমত ‘‌ওয়েল ড্রেসড‌’‌ হয়ে তবেই চিকিৎসককে রোগীর সামনে যেতে হবে। তাই বলে রঙে ভরা জাঁকজমক বাহারি জামা নয়। আমার মনে আছে, ওয়ার্ড করার সময় একদিন নীলচে একটা জামা পরে গিয়েছিলাম। শৈলেন সেন বলেছিলেন, ‘‌এইরকম রঙের জামা পরে ওয়ার্ডে আসবে না। রঙিন জামা ডাক্তারের মানায় না, তাঁর পোশাক হবে শুভ্র, স্বচ্ছ।’‌ দেখেছিলাম, জামায় বোতাম না লাগানোর জন্য ওয়ার্ডের কয়েকটি ছেলের জামা তিনি টেনে ছিঁড়ে দিয়েছেন।
✦ চিকিৎসকের আরেকটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘‌বেড সাইড ম্যানার্স’‌–‌‌ রোগী দেখতে এসে এর প্রয়োজন খুব। এই ‘‌ম্যানার’-‌এর মধ্যে পড়ে–‌‌ ‌কী করে কথা বলতে হয়, কী করে রোগীর ‘‌হিস্ট্রি’‌ নিতে হয়, তার মধ্যে বিনয় ও ভদ্রতার উপস্থিতি। সব সময় মাকে মায়ের মতো, বোনকে বোনের মতো, ভাইকে ভাইয়ের মতো করে কথা বলতে হবে;‌ বয়স্ক মানুষ থাকলে তাঁদেরও যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। এর জন্য কথাবার্তা ভাল হওয়া খুব দরকার। রোগীর সমস্যা বা মতামত শুনতে হবে তাঁকে, রোগের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ হিস্ট্রি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে হবে–‌‌ ধৈর্য হারালে চলবে না।
চিকিৎসায় ক্লিনিক্যাল সেন্স জরুরি তো বটেই, কিন্তু ওপরের দুটি উপস্থিত থাকলে তার সঙ্গে ক্লিনিক্যাল সেন্সের যথাযথ সমন্বয়েই একজন আদর্শ চিকিৎসক হওয়া সম্ভব।
ক্লিনিক্যাল সেন্স-‌এর কথাও যদি বলি, সেখানে একফোঁটাও খামতির জায়গা নেই। কারণ ডাক্তারের একটা ঠিক বা ভুল সিদ্ধান্তের ওপর একজন রোগীর বেঁচে থাকা বা না থাকা নির্ভর করে। আগেকার দিনে সি টি স্ক্যান, আলট্রাসোনোগ্রাম ছিল না–‌ তা সত্ত্বেও আমাদের যে বিশিষ্ট চিকিৎসকরা পড়াতেন, তাঁদের অপার জ্ঞান ও নির্ভুল চিকিৎসা দেখে মুগ্ধ হতাম। মনে আছে, একজন রোগী নিউমোনিয়া নিয়ে এসেছিলেন। রীতিমতো জ্বর, কাশতে কাশতে প্রচণ্ড হাঁফাচ্ছেন আর কফ বেরিয়ে আসছে। তখনও ছিলেন শৈলেন সেন। সকলকে অবাক করে মন দিয়ে কফটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই স্পুটামটা দেখো কীরকম দেখতে।’ কীভাবে এটা নিউমোনিয়ার-‌ই স্পুটাম, তা একটু একটু করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সাফল্য শুধুই তাঁর ভাল ডাক্তার হওয়ায় নয়, Best doctor হয়ে ওঠাতেও বটে।

Please follow and like us:
20

Comments

comments